দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এখন আর শুধু দলীয় কার্যালয়, সংসদ ভবন বা টেলিভিশনের আলোচনা চক্রে তৈরি হচ্ছে না। রাজনীতি তৈরি হচ্ছে মিমে, ছোট ভিডিওতে, বিষয়সূচক শব্দবন্ধে, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে, রাস্তায়, চায়ের দোকানে, পরীক্ষার হলে, বেকার তরুণের বিছানায়, আর মধ্যবিত্ত পরিবারের ড্রয়িংরুমে। শ্রীলঙ্কা ২০২২, বাংলাদেশ ২০২৪ এবং নেপাল ২০২৫ আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে, নতুন প্রজন্মের রাজনীতি আর পুরোনো নিয়মে চলে না। এখানে আগে কোনো বড় নেতা আসে না, বড় মঞ্চ তৈরি হয় না, ঘোষণাপত্র লেখা হয় না। এখানে আগে আসে ক্ষোভ, তারপর আসে ভাষা, তারপর আসে বিদ্রূপ, তারপর আসে জনতা, তারপর রাস্তা।
শ্রীলঙ্কার আরাগালায়া ছিল ক্ষুধা, জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি ও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার বিরুদ্ধে মানুষের দখলকৃত এক জনমঞ্চ। সেখানে প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে ঢুকে মানুষ শুধু ক্ষমতার ভবনে প্রবেশ করেনি; তারা রাষ্ট্রের সঙ্গে নাগরিকের পবিত্র দূরত্ব ভেঙে দিয়েছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলন শুরু হয়েছিল কোটা সংস্কারের প্রশ্ন থেকে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, ন্যায়বিচারের দাবি এবং রাজনৈতিক ক্ষোভের ভেতর দিয়ে তা বৃহত্তর গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। নেপালে ২০২৫ সালে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করা হয়েছিল নিয়ন্ত্রণের নামে; কিন্তু তরুণেরা সেটিকে পড়েছিল কণ্ঠরোধ হিসেবে। রাষ্ট্র ভেবেছিল মাধ্যম বন্ধ করলে আন্দোলন থেমে যাবে; তরুণেরা দেখাল, মাধ্যম শুধু প্রযুক্তি নয়, এটি প্রজন্মের রাজনৈতিক শ্বাস-প্রশ্বাস। এখানেই ম্যানুয়েল ক্যাস্টেলসের ‘networked movements’ ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। ক্যাস্টেলস দেখিয়েছেন, সমকালীন আন্দোলন অনেক সময় সংগঠন দিয়ে শুরু হয় না; শুরু হয় সংযোগ দিয়ে, একসঙ্গে ক্ষুব্ধ হওয়ার অনুভূতি দিয়ে, একই অপমানের স্মৃতি দিয়ে, একই ছবি দেখে কেঁপে ওঠার অভিজ্ঞতা দিয়ে, এবং একই ভবিষ্যৎ কল্পনার আকাঙ্ক্ষা দিয়ে। জয়নেপ তুফেকচি দেখিয়েছেন, ডিজিটাল যুগের আন্দোলন দ্রুত জনসমাবেশ তৈরি করতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সংগঠন ও প্রতিষ্ঠান নির্মাণ তার বড় দুর্বলতা । দক্ষিণ এশিয়ার নতুন প্রজন্মের আন্দোলনগুলো এই দুই সত্যকে একসঙ্গে সামনে এনেছে। তারা দ্রুত রাষ্ট্র কাঁপাতে পারে; কিন্তু ক্ষমতা-পতনের পর নতুন প্রতিষ্ঠান, নতুন ন্যায়বোধ এবং নতুন রাজনৈতিক শৃঙ্খলা নির্মাণে প্রায়ই তারা অনিশ্চিত, বিভক্ত ও বিপন্ন হয়ে পড়ে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ এক অদ্ভুত কিন্তু গভীর রাজনৈতিক লক্ষণ। নামটি প্রথমে হাস্যকর মনে হয়: ককরোচ! কিন্তু নৃবিজ্ঞানীর চোখে এটি কেবল কৌতুক নয়। ককরোচ এমন এক প্রাণী, যাকে ঘৃণা করা হয়, তুচ্ছ করা হয়, মেরে ফেলতে চাওয়া হয়, অথচ সে টিকে থাকে। ভারতের তরুণেরা যখন নিজেদের ককরোচ হিসেবে কল্পনা করে, তখন তারা আসলে অপমানকে উল্টে পরিচয়ে রূপান্তর করছে। যাদের বলা হয় অযোগ্য, অপ্রয়োজনীয়, ব্যর্থ, অদৃশ্য, তারা বলছে: “হ্যাঁ, আমরা আছি, আমরা টিকে আছি, আমাদের মুছে ফেলা এত সহজ নয়।” এটি জেমস স্কটের ভাষায় ‘গোপন প্রতিলিপি’ থেকে ‘প্রকাশ্য প্রতিলিপি’-তে উঠে আসা বিদ্রূপ-রাজনীতি। স্কট দেখিয়েছেন, শাসিত মানুষ সবসময় সরাসরি বিদ্রোহ করে না; তারা কৌতুক, গোপন ভাষা, ফিসফাস, ব্যঙ্গ, গল্প এবং প্রতীকের মাধ্যমে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করে। ককরোচ জনতা পার্টির রাজনীতি সেই অর্থে তুচ্ছতার বিপরীত ব্যবহার। যারা এতদিন ঘরের ভেতরে, বন্ধুর বার্তায়, অনলাইন মন্তব্যে বা পরীক্ষার প্রস্তুতির হতাশায় ক্ষোভ বলত, তারা এখন সেটিকে মুখোশ, স্লোগান, মিছিল, মিম ও জনসমাবেশে রূপ দিচ্ছে। কিন্তু এখানেই একটি জটিল প্রশ্ন আসে: এই আন্দোলনগুলো কি সত্যিই জনতার স্বতঃস্ফূর্ত বিস্ফোরণ, নাকি এগুলো বৃহত্তর অদৃশ্য রাষ্ট্রীয় খেলার অংশ? আমার উত্তর সরল নয়। ‘ডিপ স্টেট’ শব্দটি খুব সতর্কভাবে ব্যবহার করা দরকার। কারণ প্রমাণ ছাড়া সবকিছুকে গভীর রাষ্ট্রের চাল বলা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি রাষ্ট্রের দৃশ্যমান মুখের বাইরে নিরাপত্তা-যন্ত্র, আমলাতন্ত্র, গোয়েন্দা কাঠামো, কর্পোরেট পুঁজি, আন্তর্জাতিক স্বার্থ ও ভূরাজনৈতিক হিসাব কাজ করে না ভাবাও সরলতা। ফিলিপ আব্রামস আমাদের সতর্ক করেছিলেন, রাষ্ট্রকে শুধু দৃশ্যমান প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং একটি ধারণা, কল্পনা ও মতাদর্শিক নির্মাণ হিসেবেও পড়তে হবে। আখিল গুপ্ত দেখিয়েছেন, রাষ্ট্র মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কাগজ, অফিস, পুলিশ, গুজব, দুর্নীতি, অপেক্ষা এবং অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে অনুভূত হয়। তাই গভীর রাষ্ট্রকে আমি এখানে কোনো নিশ্চিত ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখছি না; বরং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অদৃশ্য স্তর বোঝার একটি সন্দেহাত্মক নৃবৈজ্ঞানিক প্রশ্ন হিসেবে দেখছি। অর্থাৎ প্রশ্নটি হলো: জনতার ক্ষোভ কোথায় নিজস্ব, কোথায় সংগঠিত, কোথায় ব্যবহৃত, কোথায় দখল হয়ে যায়, আর কোথায় রাষ্ট্র নিজেই সংকটকে নিয়ন্ত্রণের নতুন ভাষা বানায়?
বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কা ও নেপালকে যদি কেউ ‘অনুশীলন ম্যাচ’ বলে, সেটি রাজনৈতিক ভাষায় আকর্ষণীয়; কিন্তু একাডেমিকভাবে সাবধানতা দরকার। কারণ প্রতিটি আন্দোলনের নিজস্ব স্থানীয় ইতিহাস আছে। শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক ধস, বাংলাদেশে কোটা-প্রশ্ন, ন্যায়বিচারের দাবি ও রাষ্ট্রীয় সহিংসতা, নেপালে ডিজিটাল স্বাধীনতা, দুর্নীতি ও বেকারত্বের ক্ষোভ এসবকে কেবল বাইরের চাল বলে ব্যাখ্যা করলে মানুষের বাস্তব কষ্ট, রক্ত, ভয়, সাহস ও নিজস্ব রাজনৈতিক ক্ষমতা অদৃশ্য হয়ে যায়। আবার এসবকে সম্পূর্ণ পবিত্র জনতার স্বতঃস্ফূর্ততা বললেও ভুল হবে। আন্দোলন সবসময় বহু শক্তির মিলনক্ষেত্র: মানুষের ক্ষোভ, রাষ্ট্রের ভুল, আন্তর্জাতিক নজর, সংবাদমাধ্যমের ভাষা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যালগরিদম, বিরোধী শক্তির সুযোগ, এবং কখনও কখনও নিরাপত্তা-রাষ্ট্রের হিসাব। ভিক্টর টার্নারের ‘liminality’ ধারণা এখানে খুব কার্যকর। টার্নার দেখিয়েছিলেন, কিছু সময় থাকে যখন পুরোনো কাঠামো ভেঙে যায়, কিন্তু নতুন কাঠামো এখনও জন্ম নেয় না; মানুষ তখন এক মধ্যবর্তী অবস্থায় থাকে। বিপ্লবী মুহূর্ত ঠিক এমনই এক সন্ধিক্ষণ। এই সময় রাস্তা হয়ে ওঠে মঞ্চ, মিম হয়ে ওঠে ঘোষণাপত্র, ছাত্র হয়ে ওঠে নৈতিক প্রতিনিধি, আর রাষ্ট্র হয়ে ওঠে আতঙ্কগ্রস্ত দর্শক। কিন্তু সন্ধিক্ষণ স্থায়ী হয় না। প্রশ্ন হলো: এই উত্তেজনা কি নতুন গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান তৈরি করবে, নাকি পুরোনো ক্ষমতা নতুন পোশাক পরে ফিরে আসবে? ভারতের ককরোচ জনতা পার্টি তাই শুধু ভারতীয় ঘটনা নয়; এটি দক্ষিণ এশিয়ার যুব-রাজনীতির পরবর্তী পরীক্ষাগার। এখানে হাস্যরস অস্ত্র, অপমান পরিচয়, বেকারত্ব রাজনৈতিক ভাষা, আর ডিজিটাল ছড়িয়ে পড়া রাস্তায় নামার প্রস্তুতি। কিন্তু এখানেই সবচেয়ে বড় ঝুঁকি। অনলাইন আন্দোলন দ্রুত জনতা তৈরি করতে পারে, কিন্তু দ্রুত জনতা সবসময় গভীর রাজনীতি তৈরি করতে পারে না। মিম আগুন ধরাতে পারে; কিন্তু আগুনের পরে ঘর বানাতে পারে কি? বাংলাদেশি অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি, গণঅভ্যুত্থানের আনন্দের পরে শুরু হয় আরও কঠিন প্রশ্ন। কে কথা বলবে? কারা বাদ পড়বে? শহীদদের স্মৃতি কে ব্যবহার করবে? সংস্কার কে করবে? রাষ্ট্রযন্ত্র কতটা বদলাবে? পুরোনো ক্ষমতা কি নতুন ভাষায় ফিরে আসবে? নাকি নতুন প্রজন্ম সত্যিই রাজনৈতিক কল্পনার নতুন দরজা খুলবে?
তাই আমি ককরোচ জনতা পার্টিকে একসঙ্গে তিনভাবে পড়ি। প্রথমত, এটি অপমানিত তরুণদের বিদ্রূপাত্মক আত্মপরিচয়। দ্বিতীয়ত, এটি শিক্ষিত-বেকার, পরীক্ষা-নির্ভর, অনিশ্চিত মধ্যবিত্ত যুবসমাজের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। তৃতীয়ত, এটি রাষ্ট্র ও অদৃশ্য ক্ষমতার জন্যও এক ধরনের পরীক্ষা: ডিজিটাল ক্ষোভ কতদূর যায়, কত দ্রুত ছড়ায়, কারা দখল করতে পারে, কোথায় ভাঙে, কোথায় কিনে নেওয়া যায়, কোথায় দমন করা যায়। দক্ষিণ এশিয়ার নতুন প্রজন্মের রাজনীতি আমাদের শেখাচ্ছে, ভবিষ্যতের বিপ্লব হয়তো বন্দুক হাতে নয়, ফোন হাতে শুরু হবে। কিন্তু ফোনের পর রাস্তা, রাস্তার পর প্রতিষ্ঠান, প্রতিষ্ঠানের পর ন্যায়বিচার এই দীর্ঘ পথ না হাঁটলে বিপ্লব শুধু ভাইরাল স্মৃতি হয়ে থাকবে। রাষ্ট্রকে প্রশ্ন করতে হবে, গভীর রাষ্ট্রকেও সন্দেহ করতে হবে, কিন্তু জনতার নিজস্ব রাজনৈতিক ক্ষমতাকেও সম্মান করতে হবে। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ভুল হলো জনতাকে পুতুল ভাবা। আর সবচেয়ে বড় সরলতা হলো ক্ষমতাকে শুধু দৃশ্যমান মুখে সীমাবদ্ধ ভাবা। ককরোচেরা যদি একসঙ্গে হাঁটে, রাষ্ট্র ভয় পায়। কিন্তু ককরোচেরা যদি নিজেদের ভবিষ্যৎও লিখতে শেখে, তখন শুধু রাষ্ট্র নয়, পুরো রাজনৈতিক কল্পনাই বদলে যায়।


