Stay Tuned!

Policy Praxis exists to bridge the gap between knowledge and public discourse in Bangladesh. We translate scholarly research, government data, and field-level practice into concise, evidence-based, policy-relevant writing in both Bangla and English.

Analysis Religions

মাজার, স্মৃতি ও মুসলিম জনজীবন: বাংলার ইসলামি ঐতিহ্যের বিরুদ্ধে নতুন সামাজিক প্রপঞ্চ

বাংলার ইসলামি জনজীবনে মাজার কেবল অতীতের কোনো ধর্মীয় স্মারক নয়; এটি বিশ্বাস, স্মৃতি, আধ্যাত্মিক আশ্রয় এবং সামাজিক সম্পর্কের একটি জীবন্ত ক্ষেত্র। ফলে, মাজারে হামলার সাম্প্রতিক প্রবণতা বোঝার জন্য শুধু বর্তমানের কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা দেখলেই চলে না; বরং দেখা উচিত, কীভাবে অতীতের গোপন ‘জঙ্গি ও সহিংসতা’ সাম্প্রতিক সময়ে প্রকাশ্য জনতাভিত্তিক মাজার বিরোধিতায় নতুন রূপ নিল। বর্তমান বাংলাদেশে মাজারবিরোধী সহিংসতা শুধু ধর্মীয় মতভেদের ফল নয়; এটি বাংলার লোকায়ত ইসলামি ঐতিহ্য, শুদ্ধতাবাদী ধর্মচর্চা এবং নতুন জনতাভিত্তিক ধর্মীয় রাজনীতির সংঘাতের বহিঃপ্রকাশ।

বাংলাদেশে মাজারে হামলা একেবারে নতুন ঘটনা নয়। অতীতে এ ধরনের আক্রমণ প্রধানত গোপন জঙ্গি নেটওয়ার্কের পরিকল্পিত সহিংসতা হিসেবে দেখা গেছে। এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হলো সিলেটের হজরত শাহজালাল (র.)-এর মাজার। ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে মাজার প্রাঙ্গণে বোমা হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটে। একই বছরের ২১ মে ব্রিটিশ হাইকমিশনার আনোয়ার চৌধুরীকে লক্ষ্য করে মাজার প্রাঙ্গণে গ্রেনেড হামলা চালানো হলে তিনজন নিহত এবং প্রায় ৭০ জন আহত হয়েছিলেন । এসব ঘটনা প্রমাণ করে, মাজার বহু আগে থেকেই ‘উগ্রবাদী সহিংসতার’ প্রতীকী লক্ষ্য ছিল। তবে সে সময় হামলাগুলো ছিল প্রধানত গোপন, পরিকল্পিত এবং নির্দিষ্ট জঙ্গি সংগঠনের সন্ত্রাসী কার্যক্রম; সাধারণ মানুষকে প্রকাশ্যে সমবেত করে মাজার ভাঙার প্রবণতা তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। সাম্প্রতিক সময়ে এই চিত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মাজারে হামলা শুধুমাত্র বিচ্ছিন্ন নিরাপত্তাজনিত ঘটনা নয়, বরং প্রকাশ্য জনসমাবেশ, ধর্মীয় শুদ্ধতার দাবি এবং স্থানীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বের সঙ্গে জড়িত একটি সামাজিক কর্মকাণ্ড হিসেবেও দৃশ্যমান হয়েছে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থায় প্রকাশিত সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট থেকে পরবর্তী পাঁচ মাসে দেশের ৪০টি মাজারে ৪৪টি হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ১৫টি নিয়মিত মামলা ও ২৯টি সাধারণ ডায়েরি করা হয় এবং ২৩ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সর্বাধিক ঘটনা ঘটে ঢাকা বিভাগে; এরপর ছিল চট্টগ্রাম ও ময়মনসিংহ বিভাগ। এই পরিসংখ্যান দেখায়, মাজারে হামলা কোনো একটি নির্দিষ্ট অঞ্চল কিংবা স্থানীয় মতবিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তা দ্রুত একটি বিস্তৃত সামাজিক অস্থিরতার অংশ হয়ে উঠেছে।

পরবর্তী অনুসন্ধান এই প্রবণতার আরও উদ্বেগজনক মাত্রা প্রকাশ করে। মাজার ও সুফি ঐতিহ্যবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান মাকামের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে পরবর্তী ১৭ মাসে দেশে ৯৭টি মাজারে হামলার প্রমাণ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগেই ঘটে ৬৪টি ঘটনা; জেলা হিসেবে কুমিল্লায় ১৭টি, নরসিংদীতে ১০টি এবং ঢাকায় ৯টি হামলা নথিভুক্ত হয়। প্রতিবেদনে ৫৯টি ঘটনার পেছনে ধর্মীয় মতবিরোধ, ২১টির পেছনে স্থানীয় বিরোধ এবং ১৬টির পেছনে রাজনৈতিক প্রতিহিংসাকে কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব হামলায় তিনজন নিহত ও ৪৬৮ জন আহত হন; ৪৪টি মাজার পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে এবং ছয়টি মাজার বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। অর্থাৎ ধর্মীয় শুদ্ধতার ভাষ্য এখানে একা কাজ করছে না; এর সঙ্গে জমি, স্থানীয় নেতৃত্ব, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ব্যক্তিগত বিরোধও যুক্ত হচ্ছে। এই পরিবর্তনই সাম্প্রতিক মাজারবিরোধী প্রবণতাকে অতীতের ‘জঙ্গি হামলা’ থেকে পৃথক করে। হামলাকারীরা অনেক ক্ষেত্রে নিজেদের কোনো আনুষ্ঠানিক সংগঠনের পরিচয়ে নয়, বরং ‘তৌহিদী জনতা’ হিসেবে উপস্থাপন করছে। ফলে সহিংসতার দায় নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সংগঠনের পরিবর্তে এক অনির্দিষ্ট নৈতিক জনতার মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে। মাজারে হামলা তখন কেবল একটি স্থাপনা ধ্বংসের ঘটনা থাকে না; এটি হয়ে ওঠে কে ‘শুদ্ধ’, কে ‘বিচ্যুত’, এবং কার ধর্মীয় অনুশীলন জনসমক্ষে গ্রহণযোগ্য তা নির্ধারণের প্রতীকী প্রয়াস। এই সামাজিক রূপান্তরকে বুঝতেই বর্তমান মাজারবিরোধী প্রবণতাকে বাংলার ইসলামি ইতিহাস, স্থানীয় ধর্মীয় সংস্কৃতি এবং নতুন ধর্মীয় জনপরিসরের পারস্পরিক সংঘাতের মধ্যে স্থাপন করা প্রয়োজন।

বর্তমান বাংলাদেশে মাজার ভাঙার প্রবণতা কেবল ধর্মীয় অনুশীলনের একটি নির্দিষ্ট রূপের বিরুদ্ধে আপত্তি নয়; এটি বাংলা অঞ্চলে ইসলামের ঐতিহাসিক বিস্তারের প্রকৃত চরিত্রের সঙ্গেও এক ধরনের দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করে। কারণ বাংলায় ইসলাম কেবল শাসন, আইন বা ধর্মতাত্ত্বিক বিধির মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়নি; এটি কৃষি সম্প্রসারণ, নতুন বসতি, পীর-সাধকদের আধ্যাত্মিক কর্তৃত্ব, লোকায়ত বিশ্বাস এবং গ্রামীণ সমাজের অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে গণমানুষের ধর্ম হিসেবে গড়ে উঠেছে। ফলে মাজার ধ্বংসকে যদি ‘বিশুদ্ধ’ ইসলাম প্রতিষ্ঠার কাজ বলে দেখা হয়, তবে তা বাংলার ইসলামি ইতিহাসের একটি মৌলিক সত্যকে অস্বীকার করে। রিচার্ড ইটনের কাজ এই আলোচনায় কেন্দ্রীয়। The Rise of Islam and the Bengal Frontier, 1204–1760 গ্রন্থে তিনি দেখান যে, বাংলায় ইসলামায়নের ইতিহাসকে শুধু ‘conversion’ বা আকস্মিক ধর্মান্তর দিয়ে বোঝা যায় না; বরং এটি ছিল দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও পরিবেশগত রূপান্তরের অংশ। ২০২৬ সালের এক সাক্ষাৎকারে তিনি আরও স্পষ্ট করে বলেন যে, বাংলায় ইসলামায়নের ধরণ দক্ষিণ এশিয়ায় অনন্য, এবং এর কেন্দ্রে ছিল কৃষি সম্প্রসারণ, বনভূমি উন্মোচন, পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের বসতি স্থাপন এবং সেইসব অঞ্চলে সামাজিক স্থিতি তৈরির জন্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠা। তাঁর মতে, এই প্রক্রিয়ায় মুসলিম অগ্রদূতেরা জমি উন্নয়ন, শ্রম সংগঠন এবং প্রার্থনা/উপাসনার স্থান নির্মাণের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন; ফলে ইসলাম বিস্তার কেবল উপদেশের বিষয় ছিল না, বরং গ্রামীণ জীবন গঠনের সঙ্গেও সম্পর্কিত ছিল।

এই ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে সুফি, পীর ও সাধকদের ভূমিকা কেবল ধর্মপ্রচারকের নয়, বরং সামাজিক মধ্যস্থতাকারীরও। বাংলায় মসজিদ ও মাজার উভয়ই গ্রামীণ ধর্মীয় ভূদৃশ্যের অংশ হয়ে ওঠে—এই বিষয়টিও ইটনের আলোচনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে তিনি গ্রামীণ বাংলার ধর্মীয় ভূদৃশ্যে মসজিদ ও দরগাহ-সংলগ্ন স্মৃতিচর্চার গুরুত্ব নির্দেশ করেন। সে কারণেই মাজারকে ‘অ-ইসলামি’ বা ‘অতিরিক্ত’ বলে বাতিল করা বাংলার ইসলামায়নের ইতিহাসকে সংকুচিত করে। আকবর আলি খানও বাংলায় ইসলামের বিস্তারকে দীর্ঘমেয়াদি, সমাজভিত্তিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখেছেন। তাঁর বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্য: একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ গ্রন্থে প্রচলিত সরল ব্যাখ্যাগুলো যেমন, তলোয়ারের জোর, কেবল রাজশক্তির পৃষ্ঠপোষকতা বা কেবল বহিরাগত সুফিদের একক সাফল্য সমালোচনামূলক ভাবে যাচাই করা হয়েছে। ২০১৮ সালের এক বক্তৃতায় তিনি বলেন, বাংলার গ্রামীণ মানুষ পীরদের নৈতিক আকর্ষণে ইসলামের দিকে ঝুঁকেছিল এবং এই প্রক্রিয়া বোঝাতে তিনি ‘উন্মুক্ত গ্রাম তত্ত্ব’ (open village theory)-এর কথা বলেন। অর্থাৎ বাংলার ইসলামের শিকড় ছিল গ্রামীণ সমাজের উন্মুক্ত সামাজিক গঠনে, যেখানে পীর ছিলেন আস্থা, আশ্রয় ও নৈতিকতার উৎস।

বাংলা অঞ্চলের মুসলিমদের মাজারকেন্দ্রিক ঐতিহাসিক চর্চা এই তর্ককে আরও স্পষ্ট করে। সিলেটে শাহ জালালের স্মৃতি কেবল একজন ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বের স্মরণ নয়; তাঁর সমাধি দীর্ঘকাল ধরে আঞ্চলিক মুসলিম পরিচয়, ভক্তি ও পীরস্মৃতির কেন্দ্র। একইভাবে খান জাহান আলীর সঙ্গে যুক্ত বাগেরহাট অঞ্চলে সমাধি, উরস, স্মরণ ও লোকভক্তি বহু শতাব্দী ধরে ধর্মীয় সংস্কৃতির অংশ হয়ে আছে; বাংলার মুসলিম স্থাপত্য ও পীরস্মৃতির এই জটিল সম্পর্ক অঞ্চলটির ইসলামি ঐতিহ্যের অভ্যন্তরীণ উপাদান। আবার সত্যপীর ও সত্যপীরের পাঁচালি সংক্রান্ত চর্চা দেখায় যে বাংলার ইসলামি কল্পজগৎ বহু ক্ষেত্রে পীরভক্তি, দোয়া-মানত, বিপদমোচন এবং সাধারণ মানুষের সহজ আচারকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল। এই ধারার সমসাময়িক উপস্থিতিও অস্বীকার করা যায় না। পিটার জে. বার্তোচ্চি মাইজভাণ্ডারী তরিকানিয়ে তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, বাংলাদেশে পীরভক্তি ও মাজারকেন্দ্রিক অনুশীলন কেবল অতীতের অবশেষ নয়; বরং এটি দেশের কৃষিভিত্তিক ইতিহাস, সাংস্কৃতিক বহুস্বরতা এবং ধর্মীয় রাজনীতির ভেতরে এখনো গভীরভাবে প্রোথিত। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, মাইজভাণ্ডারী আন্দোলনের শিকড় দেশের agrarian history-এর সঙ্গে যুক্ত, এবং pir veneration বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় রাজনীতিতে কেন্দ্রীয় অবস্থান ধরে রেখেছে। অর্থাৎ মাজারভিত্তিক ধর্মীয় সংস্কৃতি বাংলার ইসলামি সমাজ জীবনে একটি প্রান্তিক ব্যতিক্রম নয়; এটি তার ঐতিহাসিকভাবে গঠিত এক মূলধারা।

তাহলে প্রশ্ন হলো যদি মাজার বাংলার ইসলামি ইতিহাসের এত গভীরে প্রোথিত হয়, তবে কেন বাংলাদেশের কিছু মানুষ মাজার ভাঙার প্রতি উদ্দীপ্ত হচ্ছে? এখানে সমাজবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে অন্তত তিনটি প্রক্রিয়া কাজ করছে বলে মনে হয়।

প্রথমত, এটি ধর্মকে তার স্থানীয় সংস্কৃতি, স্মৃতি ও ঐতিহাসিক অভ্যাস থেকে বিচ্ছিন্ন করার একটি প্রবণতা। অলিভিয়ার রয় এই প্রক্রিয়াকে সংস্কৃতিচ্যুতি (deculturation) বলে ব্যাখ্যা করেছেন; তাঁর মতে, আধুনিক শুদ্ধতাবাদী ধর্মীয় প্রবণতা প্রায়ই ধর্মকে স্থানীয় ইতিহাস, রীতি, লোকস্মৃতি ও সাংস্কৃতিক বহুত্ব থেকে পৃথক করে ‘বিশুদ্ধ’, গ্রন্থ নির্ভর এবং সর্বজনীন রূপে হাজির করতে চায়। এই দৃষ্টিকোণে মাজার, উরস, মানত বা পীরভক্তি স্থানীয় সংস্কৃতির ‘সংমিশ্রণ’ হিসেবে সন্দেহের চোখে দেখা হয়। বাংলার লোকায়ত ইসলাম তখন ‘বিশুদ্ধ বিশ্বাস’-এর প্রতিপক্ষ হিসেবে নির্মিত হয়। ফলে মাজার ভাঙা কেবল স্থাপত্য ধ্বংস নয়; এটি সংস্কৃতি সংলগ্ন ইসলামকে সরিয়ে গ্রন্থনির্ভর, অভিন্ন এবং শুদ্ধতাবাদী ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রতীকী কর্ম।

দ্বিতীয়ত, আধুনিক সমাজে ধর্মীয় বহুত্ব ও অনিশ্চয়তা অনেককে কঠোর নিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেয়। পিটার বার্গারের ভাষায়, আধুনিক বহুবচন (pluralisation) পুরোনো ‘সম্ভাব্যতা কাঠামো’ (plausibility structures) দুর্বল করে; তখন কিছু মানুষ অনিশ্চয়তার জবাবে দৃঢ়, একরৈখিক ও আপসহীন ধর্মীয় সত্যের আশ্রয় খোঁজে। বাংলার মাজার-সংস্কৃতি যেহেতু বহুরৈখিক, আবেগময়, লোকায়ত ও আংশিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, তাই তা শুদ্ধতাবাদী মানসিকতার কাছে ‘অস্পষ্ট’ বা ‘দূষিত’ বলে মনে হতে পারে। সেখানেই মাজার-বিরোধিতা এক ধরনের নিশ্চয়তা কেন্দ্রিক রাজনীতিতে রূপ নেয়।

তৃতীয়ত, বাংলাদেশে একটি নতুন ‘ইসলামিস্ট পাবলিক স্ফিয়ার’ এবং ডিজিটালভাবে উত্তেজিত ধর্মীয় ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। মিজানুর রহমান দেখিয়েছেন যে দাওয়াহ্‌ কার্যক্রম, মাদ্রাসাভিত্তিক কর্তৃত্ব, এবং ইসলামপন্থী সামাজিক-রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক মিলে বাংলাদেশে একটি ইসলামিস্ট জনপরিসর তৈরি করছে। অন্যদিকে আমিনুর রহমান দেখান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধর্মীয় ভাষ্য, উত্তেজনা ও সহিংসতার প্রণোদনা দ্রুত ছড়ায়, ফলে ধর্মীয় পরিচয় ও ক্ষোভ নতুনভাবে সংগঠিত হয়। এই অবস্থায় মাজার বিরোধী বক্তব্য কেবল মসজিদের খুতবা বা ছোট গোষ্ঠীর বিতর্কে সীমাবদ্ধ থাকে না; তা ভিডিও, পোস্ট, শর্ট ক্লিপ, ভাইরাল দাওয়াহ্‌ এবং ডিজিটাল নৈতিক-আতঙ্কের মাধ্যমে দ্রুত বিস্তার লাভ করে। ফলে ‘মাজার ভাঙা’ অনেকের কাছে ধর্মীয় কর্তব্যের মতো প্রতীয়মান হতে পারে।

অতএব, বর্তমান বাংলাদেশে মাজার ভাঙার প্রবণতাকে বুঝতে হলে একে শুধু ধর্মতাত্ত্বিক মতভেদ হিসেবে দেখলে চলবে না। এটি বাংলার আদি ইসলামায়নের লোকায়ত-ঐতিহাসিক উত্তরাধিকার এবং সমসাময়িক শুদ্ধতাবাদী, ডিজিটালভাবে ত্বরান্বিত, পরিচয়-রাজনীতিনির্ভর ইসলামি জনপরিসরের সংঘাত। বাংলার ইসলাম যেখানে কৃষি, পীর, আবাদ, গ্রামীণ সমাজ ও গণমানুষের বিশ্বাসের ভিতরে গড়ে উঠেছিল, সেখানে মাজার ভাঙা সেই দীর্ঘ সামাজিক স্মৃতির ওপর আঘাত। কাজেই এই প্রবণতা নতুন সামাজিক প্রপঞ্চেরই লক্ষণ, যেখানে ‘বিশুদ্ধতা’র ভাষা ব্যবহার করে ইতিহাস, লোকবিশ্বাস ও প্রজন্মান্তরের ধর্মীয় অভিজ্ঞতাকে অস্বীকার করা হচ্ছে।

    Md Sazzadul Alam

    Md Sazzadul Alam

    About Author

    Md. Sazzadul Alam is an Associate Professor in the Department of Anthropology at Jahangirnagar University, Bangladesh. He obtained his B.S.S. and M.S.S. in Anthropology from Jahangirnagar University and later completed an M.A. in Development Studies (Governance of Migration and Diversity) at the International Institute of Social Studies (ISS), Erasmus University Rotterdam, The Hague, as an OKP scholarship holder. His master’s thesis, Tourism, Development, and Migration: Resemblance of Internal Colonization in Bangladesh, received a Best Research Nomination. Since joining Jahangirnagar University in 2016, he has been actively engaged in teaching, research, and academic supervision. Before entering academia, he worked extensively in research and development organizations, including BRAC, icddr,b, a2i (Access to Information), World Vision, Good Neighbors Bangladesh, and Development Research Initiative (dRi). Through these engagements, he gained substantial experience in qualitative and mixed-methods research, impact assessment, programme evaluation, ethnography, public health research, and development studies.

    Leave a Reply

    Your email address will not be published. Required fields are marked *

    Insights – Evidence – Impact: bridging knowledge, policy and practice in Bangladesh and beyond.

    Get the latest articles at your inbox

      We welcome contributions from researchers, practitioners, policymakers, and informed commentators.

      Policy Praxis @2026. All Rights Reserved.