বিএনপির নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির মধ্যে একটি ছিল দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ। সম্প্রতি সরকার এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে। বাংলাদেশের মতো উচ্চ জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ, উচ্চ বায়ু দূষণ এবং ভঙ্গুর পরিবেশের দেশে বৃক্ষরোপণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক পদক্ষেপ। নির্বাচনের অল্প সময়ের মধ্যেই এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া ইঙ্গিত করে সরকার এই পরিবেশ বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
তবে যেনতেন ভাবে বৃক্ষরোপণ করলেই উপকার পাওয়া যায় না। বৃক্ষরোপণ প্রাণ, প্রকৃতি ও সমাজের উপকারে আসবে নাকি ক্ষতির কারণ হবে তার নির্ভর করে কীভাবে, কোথায়, এবং কোন ধরনের বৃক্ষ রোপণ করা হচ্ছে তার উপর। সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া বৃহৎ পরিসরের বৃক্ষরোপণ কখনো কখনো পরিবেশ ও মানুষের জন্য নতুন নতুন সমস্যাও তৈরি করতে পারে। গবেষণায় দেখা গেছে দক্ষিণ আমেরিকার কয়েকটি দেশে যেমন ব্রাজিল, চিলিতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির প্রণোদনা পাওয়ার লোভে মানুষ প্রাকৃতিক বন পরিষ্কার করে সেখানে বাণিজ্যিক গাছ লাগিয়েছে। ফলে বৃক্ষরোপণের মুল উদ্দেশ্য সেখানে শুধু ব্যাহত হয়েছে তা নয় উল্টো দীর্ঘ মেয়াদি ক্ষতির কারণ হয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন অঞ্চলে অস্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগানোর ফলে স্থানীয় প্রতিবেশ ব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, স্থানীয় প্রাণ,প্রকৃতি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে পরেছে এমন উদাহরণ ভুরিভুরি। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যাপকভাবে অস্থানীয় বা বিদেশি প্রজাতির বৃক্ষরোপণ জীববৈচিত্র্য কমে যাওয়া, পানি চক্রের পরিবর্তন, এমনকি স্থানীয় খাদ্যব্যবস্থা ও মানুষ–পশু সংঘর্ষের মতো সামাজিক সমস্যাও তৈরি করেছে। এসব কারণে অনেক দেশ যেমন অস্ট্রেলিয়া বাইরে থেকে গাছ, বীজ বা উদ্ভিদ আমদানি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করে।
বৃক্ষরোপণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু কম আলোচিত বিষয় হলো প্রকৃতির প্রয়োজন ও মানুষের প্রয়োজনের পার্থক্য। কোনো অঞ্চলে প্রাকৃতিকভাবে যে গাছ জন্মায়, তা স্থানীয় প্রতিবেশ ব্যবস্থার সঙ্গে দীর্ঘদিনের অভিযোজনের ফল। সেসব গাছের সরাসরি অর্থনৈতিক মূল্য নাও থাকতে পারে। কিন্তু মানুষ সাধারণত বৃক্ষরোপণে অর্থনৈতিক বা নান্দনিক মূল্যকে বেশি গুরুত্ব দেয়। যেসব গাছপালার অর্থনৈতিক বা নান্দনিক মূল্য নেই সাধারণ মানুষ সেসব গাছাপালা রোপণ করা বা রেখে দেয়ার ব্যাপারে আগ্রহ দেখায় না। ফলে পরিবেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও অর্থনৈতিকভাবে কম লাভজনক অনেক প্রজাতির গাছ উপেক্ষিত থাকে। দীর্ঘমেয়াদে এতে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। বাংলাদেশে বৃক্ষরোপণের অতীত অভিজ্ঞতা পুরোপুরি ইতিবাচক নয়। স্বাধীনতার পর থেকে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার উদ্যোগে ব্যাপকভাবে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি পরিচালিত হয়ে আসছে। কিন্তু বৃক্ষরোপণ অভিযানে অনেক ক্ষেত্রে পরিবেশগত প্রয়োজনের পরিবর্তে দ্রুত অর্থনৈতিক লাভের দিকটি বেশি গুরুত্ব পেয়েছে। এর ফলে দেশের বেশ কিছু অঞ্চলে বিদেশি প্রজাতির গাছের ব্যাপক বিস্তার ঘটেছে। উত্তরাঞ্চলে ইউক্যালিপটাস এবং পার্বত্য চট্টগ্রামে সেগুনের ব্যাপক চাষ এ ধরনের উদাহরণ হিসেবে প্রায়ই আলোচিত হয়। স্থানীয়রা প্রায়শই অভিযোগ করেন যে এসব একক প্রজাতির বাগান তাদের স্থানীয় পরিবেশ ও পানি ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। বিভিন্ন গবেষণায় এমন দাবির সত্যতা মিলেছে। এ ছাড়া অতীতে কোথাও কোথাও প্রাকৃতিক বন উজাড় করে বাণিজ্যিক প্ল্যান্টেশন তৈরির উদাহরণও আছে। শেরপুর ও জামালপুর সীমান্তবর্তী প্রাকৃতিক বনাঞ্চল যা এশিয়ান হাতির আবাস্থল হিসাবে বিখ্যাত, সেসব প্রাকৃতিক বন উজাড় করে বাণিজ্যিক প্লানন্টেশন তৈরি করা হয়েছে। শেরপুরের গজনী অবকাশ কেন্দ্র পরিকল্পনাহীন বৃক্ষরোপনের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এই প্রেক্ষাপটে নতুন করে বৃহৎ পরিসরে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি গ্রহণের ক্ষেত্রে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া জরুরি। আশার কথা, প্রধানমন্ত্রী পরিবেশগত বিষয় বিবেচনায় রেখে বৃক্ষরোপণের কথা বলেছেন এবং এ সংক্রান্ত কমিটিতে বিষয় ভিত্তিক বিশেষজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তবে বাংলাদেশের বাস্তবতার একটি বড় সমস্যা হলো জমি। বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম উচ্চ ভূমি ব্যবহারকারী দেশ। আমাদের প্রায় সব জমিই কোনো না কোনো কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই নতুন করে কোথায় বৃক্ষরোপণ করা হবে এটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন। এ ক্ষেত্রে একটি সমাধান হতে পারে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বা অস্থানীয় প্রজাতির গাছ ধীরে ধীরে অপসারণ করে সেখানে পরিবেশবান্ধব স্থানীয় প্রজাতি রোপণের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে। স্থানীয় প্রজাতির বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিকে আরেকধাপ এগিয়ে পরিকল্পিতভাবে বনায়ন সৃজন করা যেতে পারে। আধুনিক বনবিজ্ঞানকে কাজে ছোট ছোট বন তৈরি করা যেতে পারে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এখন এমন পরিকল্পিত ছোট বন (Tiny Forest) ধারনা জনপ্রিয় হচ্ছে, বিশেষ করে শহর অঞ্চলে। এ রকম ছোট বনের মুল মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এগুলো খুব ছোট জায়গায় তৈরি করা যায়, খুব ঘনভাবে স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগানো হয় যা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং পাখি, পোকামাকড় ও ছোট প্রাণীর আবাস তৈরি করে। এমন একটা বন তৈরির পদ্ধতি হচ্ছে জাপানি উদ্ভিদবিদ ড. আকিরা মিয়াওয়াকি উদ্ভাবিত মিয়াওয়াকি বন। এই পদ্ধতিতে অল্প জায়গায় খুব ঘন করে স্থানীয় প্রজাতির বিভিন্ন উদ্ভিদ একসাথে রোপণ করা হয়। সূর্যের আলোর পাওয়ার তীব্র প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে উদ্ভিদগুলো দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং স্বল্প সময়ে ঘন বন তৈরি হয়। বাংলাদেশের মত ঘনবসতিপূর্ণ দেশ যেখানে জমি নিয়ে প্রতিযোগিতা অত্যান্ত তীব্র সেখানে শহুরে ছোট বন, মিয়াওয়াকি বনের মত ধারণা অত্যান্ত কার্যকরি পদক্ষেপ হতে পারে।
বৃহৎ পরিসরে বৃক্ষরোপণের আরেকটি বাস্তব সমস্যা হলো প্রয়োজনীয় চারা সরবরাহ। পরিবেশগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক স্থানীয় প্রজাতির গাছের চারা নার্সারিতে সহজে পাওয়া যায় না, কারণ এগুলোর অর্থনৈতিক বা নান্দনিক মূল্য তুলনামূলক কম। পরিবেশের জন্য উপকারী গাছের চারা স্থানীয় বাজারে পাওয়া না গেলে, উচ্চ পর্যায়ের নির্দেশ থাকা স্বত্বেও মাঠ পর্যায়ের কর্মীরা ক্ষতিকর বৃক্ষ রোপণ করে তাদের কোঠা পূরণ করার চেষ্টা করতে পারে। ফলে বড় আকারে পরিবেশের সাথে মাননসই বৃক্ষ রোপণ করতে হলে আগে পরিকল্পিতভাবে চারা উৎপাদনের ব্যবস্থা করতে হবে। বৃহৎ বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি নিঃসন্দেহে পরিবেশ সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তবে এই উদ্যোগ সফল করতে হলে পরিবেশগত জ্ঞান, স্থানীয় বাস্তবতা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার সমন্বয় অপরিহার্য।


